
কুমিল্লা নগরীর অন্যতম পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আওয়ার লেডি অব ফাতিমা গার্লস হাই স্কুল-এর প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে বেতন ও ফি সংক্রান্ত অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব, শিক্ষার্থীদের উপর মানসিক চাপ, ধর্মীয় আচরণে বৈষম্যসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব অনিয়মের প্রতিবাদে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ সত্ত্বেও প্রশাসনের নিরবতায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হলেও প্রধান শিক্ষিকা রিনা মারিয়া কস্তা নিজস্ব ক্ষমতাবলে সরকার নির্ধারিত নিয়ম উপেক্ষা করে অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, সরকার নির্ধারিত টিউশন ফির চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ফি আদায় করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। এছাড়া ভর্তি, পরীক্ষা, উন্নয়ন, উৎসব, সহযোগিতা ইত্যাদি নানা খাত দেখিয়ে রসিদবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এক অভিভাবক জানান, “আমার মেয়েকে ভর্তি করাতে গিয়ে বোর্ড নির্ধারিত ফির চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। না দিলে ভর্তি বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়।”
২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি নির্ধারণ করে। সে অনুযায়ী পৌর এলাকায় ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত মাসিক ৩০০ টাকা এবং ৯ম ও ১০ম শ্রেণির জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। একই সিদ্ধান্ত মোতাবেক জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়ছার ১৮ ডিসেম্বর জেলা কমিটির সভায় কুমিল্লার জন্যও ফি নির্ধারণ করে দেন। বেশিরভাগ বিদ্যালয় তা মানলেও ফাতিমা গার্লস স্কুলে ৪র্থ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮০০ টাকা করে মাসিক ফি নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ডায়েরি, আইডি কার্ড, গ্রামার বইসহ নানা অজুহাতে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক দাবি করেছেন, উন্নয়ন ফি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবছর টাকা নেওয়া হলেও শ্রেণিকক্ষে তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন চোখে পড়ে না।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এক সাবেক কাউন্সিলর বলেন, “এই স্কুলে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষকের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য এলাকাবাসীর জানা।”
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের চাকরি দেওয়া হয়েছে, যা বিদ্যালয়ের শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এক সময় সুশৃঙ্খল ও মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি এখন নানা অনিয়ম, ভয়ভীতি ও হেনস্তার জায়গায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ অভিভাবকদের। এক ছাত্রী বলেন, “স্কুলে কোনো প্রশ্ন তুললেই আমাদের বলা হয়—চুপ থাকো, না হলে নম্বর কেটে দেওয়া হবে।”
ধর্মীয় অনুশীলন নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের হিজাব পরা, মেহেদি দেওয়া ইত্যাদি নিয়ে আপত্তিকর আচরণের অভিযোগ উঠেছে প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। এক অভিভাবক বলেন, “আমার মেয়েকে শুধু মেহেদি দেওয়ার কারণে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবাদ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
শিক্ষকরা নিজেরাই টিউশনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আইসিটি ও বিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে এসব অভিযোগ বেশি। এক অভিভাবক জানান, “স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস না করিয়ে টিউশনের জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। এটা দুঃখজনক।”
বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে নানাবিধ অনিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন ফি নিলেও ক্লাসরুম সংস্কার, বেঞ্চ রং ইত্যাদিতে আবার নতুন করে টাকা দাবি করা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলেই তার সন্তানের উপর হেনস্তা শুরু হয়।
বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি কার্যত প্রধান শিক্ষিকার একক কর্তৃত্বে চলছে বলেও অভিযোগ। এক সাবেক অভিভাবক সদস্য বলেন, “আমাদের মতামত নেওয়া হয় না। যা সিদ্ধান্ত আসে তা উপরের নির্দেশ বলেই জানানো হয়।”
এই পর্যন্ত প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে অন্তত আটটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে। অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি, বরং কাগজপত্র আটকে আছে।
অভিভাবকদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ফি বাস্তবায়ন, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, পরিচালনা কমিটিতে অভিভাবক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা আয় করে। চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কর রেয়াত পেলেও অতিরিক্ত ফি চাপিয়ে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের উপর।
বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির অভিভাবক প্রতিনিধি মো. কামরুল হাসান বলেন, “বেশ কিছু অভিভাবক অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। আমরা তা সভায় উপস্থাপন করেছি, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে ফি কমানো সম্ভব হয়নি।”
অন্য এক অভিভাবক প্রতিনিধি শাবিবা শারমিন রেজা বলেন, “বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সভায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির অভিভাবক প্রতিনিধি মীর্জা মোহাম্মদ হাফিজ বলেন, কিছু অভিভাবক অতিরিক্ত ভর্তি ফি সহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছে। আমরাও তা পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে আমরা পরবত্তী বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভায় এ নিয়ে আলোচনা করবো।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষিকা রিনা মারিয়া কস্তা বলেন, “আমাদের প্রতিষ্ঠানটি ক্যাথলিক চার্চের অধীনে পরিচালিত। সেই চার্চের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফি নির্ধারিত হয়। সরকারি নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি নেওয়ার বিষয়ে উপদেষ্টা বরাবর আবেদন করেছি, যা প্রক্রিয়াধীন। বাকি অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, তারা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে অতিরিক্ত ফি নিচ্ছেন এবং উপদেষ্টার কাছে আবেদন করেছেন। আবেদন গৃহীত না হলে তারা অতিরিক্ত ফি নিতে পারেন না। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছি।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফি নির্ধারণ করেছি। কিছু প্রতিষ্ঠান সেই নির্দেশনা লঙ্ঘন করছে, আমরা খোঁজ নিচ্ছি এবং ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শামছুল ইসলাম বলেন, “সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত ফি গ্রহণ বেআইনি। আমরা অভিযোগ পেয়েছি এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”
ছবিঃ আওয়ার লেডি অব ফাতিমা গার্লস হাই স্কুল, কুমিল্লা।