
গোমতি নদীর চর দখল করে কোটি কোটি টাকার মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দূর্গাপুর ইউনিয়নের আড়াইওড়া মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. জহিরুল ইসলাম ওরফে ‘মাটি খেকো জহির’। স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ধারী এই ব্যক্তি বিগত ১৭ বছর ধরে দাপটের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন মাদক ব্যবসা, জমি দখল, ধর্মীয় স্থাপনায় হস্তক্ষেপসহ একের পর এক অনৈতিক কাজ—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
এক সময়ের চালের দোকানের কর্মচারী জহিরুল ইসলামের বাবা ছিলেন একজন ক্রোকারিজ দোকানের কর্মচারী। অভাব-অনটনের মধ্যেই কাটছিল তাদের জীবন। কিন্তু ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভাগ্য বদলে যায় জহিরের। শুরু হয় তার প্রভাবশালী হয়ে ওঠার গল্প। দলীয় পরিচয় ও ক্ষমতার বলয়ে মাদক ব্যবসা, অন্যের জমি দখল ও গোমতি নদীর চর কেটে মাটি বিক্রি করে তিনি হয়ে উঠেন কোটি টাকার মালিক।
সম্প্রতি জহিরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি এসেছে ধর্মীয় জমি দখল ও মাটি কাটার বিষয়ে। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আড়াইওড়া শাহগঞ্জ এলাকায় সুফি সাধক সৈয়দ শের আলী শাহ (রঃ)-এর সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সম্পত্তির জমি দখল করে প্রায় ১০ লাখ ঘনফুট মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ করেন পীরের বংশধর সৈয়দ আসিফ শাহ।
আসিফ শাহ কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করেন, গত ১০ জুলাই বিকালে জহির মিয়া ৫/৬ জন সহযোগী নিয়ে ভেকু মেশিনসহ ধর্মীয় জমিতে ঢুকে মাটি কাটতে শুরু করেন। বাধা দিতে গেলে আসিফ ও তার পিতাকে মারধর করা হয়। এমনকি ছেনি দিয়ে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তার অভিযোগ অনুযায়ী, দখলকৃত ১৭২ শতক জমি থেকে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকার সমমূল্যের মাটি তুলে বিক্রি করা হয়েছে। স্থানীয়রা এ ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়লেও জহিরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ, পূর্বেও প্রতিবাদকারীদের ওপর নেমে এসেছে হামলা ও হয়রানির অভিযোগ।
এ বিষয়ে পীর সৈয়দ আকছির শাহ বলেন, “আমার জমিতে চারা গাছ রাখার অনুমতি চেয়েছিল জহির। আমি মানবিক কারণে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু পরে জানতে পারি, সে সেই জমি থেকে লক্ষ লক্ষ ঘনফুট মাটি কেটে নিয়েছে। আমরা বাধা দিতে গেলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।”
তিনি জানান, বিষয়টি শুনে দরবার শরীফের ভক্তদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পীর সাহেব নিজেই তাদের শান্ত করেন এবং আইনি পথ বেছে নেন।
এ বিষয়ে কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহিনুল ইসলাম বলেন, “অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতেও একাধিক অভিযোগ করা হলেও জহিরের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, বিগত ১৭ বছর ধরে জহির স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গোমতি নদীর চরের মাটি কেটে নদীর বাঁধকে হুমকির মুখে ফেলেছেন বারবার। সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাণিজ্যিকভাবে মাটি উত্তোলন করে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জহিরের এসব অপকর্মে সহযোগিতা করেছেন সাবেক ইউপি সদস্য কাকলি আক্তার ও আরমান মিয়া নামের স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী। মাদক ব্যবসায়েও রয়েছে জহিরের সম্পৃক্ততা। কয়েকটি ওয়ার্ডে মাদক ব্যবসার জন্য আলাদা ‘টাকা বিনিয়োগ’ করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে প্রতিদিন সন্ধার পর থেকে রাত পযন্ত ওই স্থানে মাদকের আসর বসায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এক সময় আত্মগোপনে চলে যান জহির। তবে সম্প্রতি স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে ‘মাসিক মাসোহারার’ চুক্তিতে পুনরায় সক্রিয় হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় যুবদল নেতা নাজমুল হাসান বলেন, “বিগত ১৭ বছর ধরে মাদক, জমি দখল, চর দখল—এমন কোনো অপকর্ম নেই যা সে করেনি। আওয়ামীলীগের আমলে মামলা দিয়ে হয়রানি করে আমাদের, মামলার জুট জামেলা পেহাতে পোহাতে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমরা। এখন আবার স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যাক্তিকে প্রতিমাসে মাসোহারা দিয়ে ম্যানেজ করে নতুন করে দাপট দেখাচ্ছে।”
এ বিষয়ে বিএনপির উত্তর দূর্গাপুর ইউনিয়ন ৮নং ওয়ার্ডের সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “শুনেছি জহির এখন স্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মাটি বিক্রি করছে। আওয়ামীলীগ নেতা হয়ে এখন মাটি কেটে নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের হুমকির মুখে ফেলছে তা হতে পারেনা। বিষয়টি প্রশাসন ও আমার দলের সিনিয়র নেতাদের জানাবো।”
এ বিষয়ে জহিরুল ইসলাম দাবি করেন, “আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা। পীর সাহেবের অনুমতি নিয়েই তাদের মাটি বিক্রি করেছি। মাটির কিছু টাকাও দিয়েছি। এখন তারা অস্বীকার করছে।”
তবে স্থানীয়দের মতে, মাটি খননের জন্য কোনো লিখিত অনুমতি বা বৈধ দলিল দেখাতে পারেননি জহির। তার কথায় বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এত অনিয়মের অভিযোগ সত্ত্বেও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও। স্থানীয়দের অভিযোগ, জহির প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছায়ায় থেকে আইনের বাইরে অবস্থান করে আসছেন।
এখন যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের দিকে, তখনই ধর্মীয় জমি দখলের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে আবারও জড়িয়ে পড়েছেন জহির। এতে করে সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ছবিঃ আওয়ামীলীগ নেতা জহির।